ডা. প্রিন্স ঘোষ
মা, শব্দটি ছোট হলেও মাহাত্ম্য অনেক। একজন সন্তানের কাছে তার মা সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। কিন্তু অনেক সময় পত্রিকার পাতা উল্টালেই চোখে পড়ে কিছু মায়ের ভয়ংকর দিক। বাংলাদেশে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মায়ের হাতে হত্যার শিকার হয়েছে শিশু সন্তান। প্রশ্ন জাগতেই পারে, একজন মা কীভাবে তার সন্তানকে হত্যা করতে পারেন, যেখানে একজন সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান তার মায়ের কোল।
২০১৬ সালে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে এক মায়ের হাতে তাঁর সাত মাসের কন্যাশিশুর হত্যার ঘটনা ঘটে। পরিবার মারফত জানা যায়, হত্যাকারী সেই মা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং চিকিৎসাধীন ছিলেন।
২০২৫ সালে Asian Journal of Psychiatry-তে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র থেকে উঠে এসেছে এর কী কারণ। এই গবেষণাপত্রে তিনজন বাংলাদেশি মায়ের ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়। উক্ত গবেষণায় দেখা যায়, তিনজন মা-ই সন্তান হত্যার ঘটনার পর মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান এবং তাঁদের সবারই চিকিৎসাযোগ্য মানসিক রোগ ছিল।
তবে সব হত্যাই মানসিক রোগের কারণে হয়ে থাকে, এমনটাও নয়। ১৯৬৯ সালে American Journal of Psychiatry-তে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. ফিলিপ রেসনিক বলেন, অভিভাবকের হাতে সন্তানের মৃত্যুর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে—গুরুতর বিষণ্নতা, সাইকোসিস, অবাঞ্ছিত সন্তান, দীর্ঘদিনের নির্যাতন কিংবা পারিবারিক প্রতিশোধের মতো বিভিন্ন কারণ থাকে। এবং প্রতিটি ঘটনার পেছনের বাস্তবতা আলাদা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও বেশ কিছু সামাজিক বাস্তবতাও রয়েছে। বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে মাতৃত্ব বাংলাদেশের একটি সাধারণ ব্যাপার। তাছাড়া অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, শ্বশুরবাড়ির অতিরিক্ত কাজের চাপ, পারিবারিক সহিংসতা, স্বামীর মানসিক নির্যাতন ও আর্থিক সংকট একজন মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এর ফলে তৈরি হওয়া মানসিক বিষণ্নতাও অনেক ক্ষেত্রে এমন অপরাধের জন্য দায়ী।
PLOS ONE বাংলাদেশে ঢাকার তিনটি বস্তি এলাকায় ৩৭৬ জন প্রসূতি মায়ের ওপর গবেষণা চালায়। গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৩৯.৪ শতাংশ মা প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। গবেষণায় আরও দেখা যায়, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থায় মানসিক চাপ, স্বামীর সহিংস আচরণ, চাকরি হারানো এবং ঋণ করে প্রসবের খরচ বহনের মতো বিষয়গুলো বিষণ্নতার ঝুঁকি অনেক পরিমাণে বাড়িয়ে দেয়।
কোনো মা যদি বিষণ্নতায় ভোগেন বা প্রসব-পরবর্তী মানসিক রোগে ভোগেন এবং যদি সন্তান বা নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করেন, তবে তাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে মানসিক রোগের চিকিৎসা দেওয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের সহায়তা ও স্বামীর সহযোগিতা মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যকে ভালো রাখতে অতি গুরুত্বপূর্ণ।
এমন ভয়ংকর অপরাধের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে, এর মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা একটি। তাই মায়ের স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া অনেকাংশে এমন অপরাধ কমাতে সাহায্য করতে পারে।