আজ ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জুলাই, ২০২৬ ইং

ভিন্ন চোখে দেবদাস: ভালোবাসা নাকি আত্মকেন্দ্রিকতার করুণ পরিণতি?

প্রিন্স ঘোষ

বাংলা সাহিত্যে দেবদাস একটি অমর চরিত্র। হৃদয় ভেঙে যাওয়া অসংখ্য বাঙালী যুবক দেবদাসের নাম শুনলে আবেগ আপ্লুত হয়ে যায়। নিজেকে দেবদাসের সাথে অনায়াসেই তুলনা করে ফেলে। সমাজে আমরাও হৃদয় ভাঙা পুরুষদের দেবদাস বলেই ডাকি। অবচেতন ভাবে পার্বতী অর্থাৎ পারোকেও আমরা হৃদয় ভেঙে ফেলার দায়ে দায়ী করে থাকি।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর কীর্তি দেবদাস ও পারো চরিত্র। পারোর বিয়ে হয় বয়েসে অনেক বড় এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারের জমিদারের সাথে।
আমাদের জীবনের পারো কে উদ্দ্যেশ করে প্রায়শই আমরা হৃদয় ভাঙা গানের সুরে দেবদাস সিনেমার শেষ দৃশ্যটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে থাকি। যেখানে দেখা যায়, পারোকে হারিয়ে অত্যাধিক মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়ে দেবদাস। আত্মধ্বংসী জীবনযাপন ও মদ্যপানের কারণে দেবদাসের শারীরিক অবস্থা প্রচণ্ড খারাপ হয়ে পড়ে। মৃত্যুর আগে সে পারোকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য পারোর বাড়ির সামনে যায়, কিন্তু সমাজের নিয়ম ও পারিবারিক বাধার কারণে পারো তার সঙ্গে শেষবার দেখা করতে পারে না। পারো সব ফেলে ছুটে আসতে চায় দেবদাসের কাছে, কিন্তু সে পৌঁছানোর আগেই বন্ধ হয়ে যায় বাড়ির প্রধান ফটকের দরজা। করুণ মৃত্যু হয় দেবদাসের। শেষ দেখা হয় না পারো ও দেবদাসের। এই দৃশ্যটিই দেবদাসকে পরিণত করে বাংলা সাহিত্যের ট্র্যাজিক প্রেমিক, যে কিনা তার ভালবাসাকে পাওয়া তো দূরের কথা, শেষ বারের মত দেখতেও পায় না।
তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, দেবদাসের এই ট্র্যাজেডির পেছনের মূল ভূমিকা দেবদাস নিজের। ছোট থেকেই দেবদাস ও পারো ছিল ভাল বন্ধু। সময়ের পরিক্রমায় তাদের বন্ধুত্ব পরিণত হয় ভালবাসার সম্পর্কে। অত্যন্ত চঞ্চল দেবদাসের দুষ্টুমির কারণে পরিবার তাকে পাঠিয়ে দেয় শহরে পড়াশোনার জন্য। দেবদাস পড়াশোনা শেষে ফিরে এলে পারোর পরিবার দেবদাসের সাথে বিয়ে প্রস্তাব দিলে দেবদাসের ধনী ও অভিজাত পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করে। পারো ছুটে যায় দেবদাসের কাছে, জানায় ভালবাসার পূর্ণতা স্বরূপ তাকে বিয়ে করতে। কাপুরুষ দেবদাস নিজের ভালোবাসার পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে না। কলকাতা ফিরে দেবদাস চিঠি মারফত দেবদাস পারোকে জানায়, সে পারোকে সেই অর্থে ভালবাসেইনি এবং তাদের বিয়ে সম্ভব নয়। এর পর পারোর বিয়ে হয়ে যায় অন্যত্র। এরপর দেবদাস বুঝতে পারে তার ভুল এবং পরিণত হয়ে যায় ট্র্যাজিক এক প্রেমিকে।
সবাই দেবদাসকে হৃদয় ভাঙা প্রেমিক বললেও, আমার মূল্যায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমার দৃষ্টিতে দেবদাস একজন অহংকারী ও কাপুরুষ, যার নিজের ভালবাসার জন্য শক্তভাবে দাঁড়ানোর শক্তিই কখনো ছিল না। দেবদাসের আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা ভাবনাই ছিল মূল দায়ী তার করুণ অবস্থার জন্য। দেবদাস ভালবেসে ট্র্যাজিক দেবদাস হয়নি। তার কাপুরুষতা, ছোট হতে না চাওয়া ও আত্ম অহংকারই তাকে পরিণত করেছিল গল্পের সেই ট্র্যাজিক দেবদাসে। তাই হৃদয় ভাঙা যুবকদের হরহামেশাই নিজেকে দেবদাসের সাথে তুলনা করার বিপক্ষে আমি। প্রকৃতপক্ষে দেবদাস কখনো তার ভালবাসাকে সম্মানই দিতে পারেনি। তাই বাংলার সকল হৃদয় ভাঙা পুরুষ দেবদাস হতেই পারে না। দেবদাস ছিল একজন ব্যর্থ ও কাপুরুষ প্রেমিক, যে কিনা পারোর ভালবাসাকে অসম্মান ও অবহেলা ছাড়া আর কোন কিছুই দিতে পারেনি। দেবদাসকে করুণা করা যায়, কিন্তু আদর্শ প্রেমিকের মানদণ্ডে তিনি একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

Comments are closed.

     এই বিভাগের আরও সংবাদ